You are here: Home » সংস্কৃতি » বিদায় আব্দুল জব্বার

বিদায় আব্দুল জব্বার 

1504161827

৩১ আগষ্ট, ২০১৭ ইং

বিদায় আব্দুল জব্বার
স্বাধীনতা সংগ্রামে যার কণ্ঠ প্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই কিংবদন্তি শিল্পী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি … রাজেউন)। বেশ কিছুদিন ধরেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। গত চার মাস ধরে হাসপাতালেই ছিলেন। এক সপ্তাহ ধরে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। সেই অবস্থা থেকে আর ফেরা হলো না এই কণ্ঠযোদ্ধার, চলে গেলেন না ফেরার দেশে। গতকাল বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শিল্পীর মরদেহ আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে শিল্পীকে দাফন করা হবে।

বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন সাংবাদিকদের জানান, শিল্পী আব্দুল জব্বার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক কিডনি ও হূদরোগে ভুগছিলেন। গতকাল সকাল থেকে তার লিভার, কিডনি ও মাল্টিপোল অর্গান কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আইসিইউ ইনচার্জ ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, শিল্পীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আব্দুল জব্বার শুধু শিল্পী নন, ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার গান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা। তার গান সাধারণ মানুষের মাঝে জাগিয়ে তুলতো যুদ্ধজয়ের অমিত শক্তি। তার কণ্ঠে ছিল সম্মোহনী সুর, মৃতসঞ্জীবনী সুধার মতো জাগিয়ে দিত মুক্তি-পাগল বাঙালিকে। তার গাওয়া গান গত ছয় দশক ধরে আমাদের উদ্দীপ্ত করে চলেছে। সংগীত শিল্পী আব্দুল জব্বারের কণ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের হূদয়ের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছে।

আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়..’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম..’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়..’ -এ গান ৩টি ২০০৬ সালে মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নেয়।

শিল্পীর সংগীত জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অবদান হচ্ছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান। অসংখ্য কালজয়ী গানে কণ্ঠ দেওয়া এ শিল্পী মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঁধে হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে গেরিলাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে উদ্দীপনামূলক গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং জনগণকে উজ্জীবিত করেন। ওই দুঃসময়ে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অসংখ্য গান গেয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন স্থানে গণসংগীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ টাকা তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুম্বাইয়ে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত তৈরিতেও নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

শিল্পী আব্দুল জব্বারের হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আলী আশরাফ আখন্দ জানান, শিল্পী তার প্রথম স্ত্রী হালিমা জব্বারের ঘরে ২ ছেলে মিথুন জব্বার ও বাবু জব্বার এবং এক মেয়ে টুনটুন জব্বার, আর দ্বিতীয় স্ত্রী শাহীন জব্বারের ঘরে একমাত্র মেয়ে মুনমুন জব্বারকে রেখে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্পীর চিকিত্সার জন্য ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। এছাড়াও তার চিকিত্সা সহায়তায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনুদান দিয়েছিল।

শোকের ছায়া: বাংলা গানের এই কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক আইন মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, শিল্পী তিমির নন্দী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই হাসপাতালে ছুটে যান। হাসপাতাল থেকে শিল্পীর মরদেহ ১২টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিল্পীর গোসলের কাজ শেষে তার মরদেহ কলাবাগানের ভুতের গলি ৫৭/সি, নর্থ সাউথ রোডের ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মহল্লাবাসীর শোক প্রকাশের পর তার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিম ঘরে রাখার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

এ শিল্পীর প্রয়াণে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, মুক্তিযুদ্ধে তিনি কণ্ঠসৈনিক হিসেবে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা এ শিল্পীর সংগীত সংরক্ষণে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

শিল্পী আবদুল জব্বার ১৯৩৮ সালে ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ওস্তাদ ওসমান গণি ও ওস্তাদ লুত্ফুল হকের কাছে তিনি সংগীতে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম রেডিওতে এবং ১৯৬৪ সালে টিভিতে প্রথম কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন ও স্থায়ী শিল্পী হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। দরাজ ও দরদীকণ্ঠের অধিকারী এ শিল্পী আধুনিক বাংলা গানের বিভিন্ন পর্যায়ের গান গেয়েছেন। সব গানেই সমান স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন এই শিল্পী। নানা ঘরানার কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের গানও রয়েছে। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, সালাম সালাম হাজার সালাম, ওরে নীল দরিয়া, এ মালিকে জাহান, বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা, এ আঁধার কখনো যাবে না মুছে, এক বুক জ্বালা নিয়ে, আমি তো বন্ধু মাতাল নই, কি গান শোনাব ওগো বন্ধু, মুজিব বাইয়া যাও রে প্রভৃতি।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি একুশে পদক (১৯৮০), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬), বঙ্গবন্ধু পদক (১৯৭৩), জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস আজীবন সন্মাননাসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা অর্জন করেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক: শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তার মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এছাড়া শব্দসৈনিক আব্দুল জব্বারের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম।

জেপির শোক: দেশের সংগীত জগতের অন্যতম প্রধান শিল্পী এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোকবার্তায় জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, মরহুম আব্দুল জব্বার আমাদের সংগীত জগতের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা ছিলেন। তার ইন্তেকালে আমাদের সংগীতাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। ইত্তেফাক রিপোর্ট

Add a Comment