You are here: Home » অপরাধ » আজ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৩ বছর শেখ হাসিনার ওপর প্রথম হামলা, শেষ হামলা

আজ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৩ বছর শেখ হাসিনার ওপর প্রথম হামলা, শেষ হামলা 

5999e6a3abbac

আজ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৩ বছর
শেখ হাসিনার ওপর প্রথম হামলা, শেষ হামলা
বিশেষ প্রতিনিধি
২১ আগস্ট ২০১৭, ০৬:৫৩

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন তিনি। হামলার পরের দিন দুপুরে ধানমন্ডির বাসায় শেখ হাসিনা l ছবি: শামসুল হক২০ জুলাই, ২০০০। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশস্থলের কাছে শক্তিশালী বোমা পুঁতে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল জঙ্গিরা। এরপর আরও অন্তত তিনবার একই চেষ্টা করে তারা। সর্বশেষ হত্যাচেষ্টা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায়। তাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও মারা গেছেন ২২ জন নেতা-কর্মী। আহত হন শেখ হাসিনাসহ কয়েক শ নেতা-কর্মী। আজ ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলার ১৩ বছরপূর্তি।

প্রথম ঘটনার বিচার শেষ হতে লেগেছে ১৭ বছর। গতকাল রোববার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ ওই ঘটনায় করা দুই মামলায় রায় ঘোষণা করেন। তাতে ১০ জনের ফাঁসির দণ্ড এবং আরও ১৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) নেতা-কর্মী।

প্রথম হত্যাচেষ্টার ঘটনার সময় শেখ হাসিনা ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। আর শেষ ঘটনার সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। মাঝে ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় বোমা পেতে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হুজি-বি। কিন্তু হামলার আগেই জনসভাস্থলের অদূরে বোমা বিস্ফোরণে জঙ্গিদের দুই সদস্য নিহত হন। ফলে শেষ পর্যন্ত ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি জঙ্গিগোষ্ঠীটি। ওই ঘটনায় মামলা হলেও শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা শুরুতে জানাজানি হয়নি।

ওই ঘটনায় জড়িত হিসেবে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এহ্‌তেশাম উল হকের নাম আসে। যিনি ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মেজর জেনারেল হন এবং রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। এ বিষয়ে ২০০৯ সালের ১১ অক্টোবর প্রথম আলোয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার ওই কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠিয়ে দেয়। অবশ্য এহ্‌তেশাম উল হককে মামলার তদন্তের আওতায় আনা হয়নি।

২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাত আটটার দিকে সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভাস্থলের কাছাকাছি ফাজিল চিশত এলাকার একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে দুই জঙ্গি নিহত হন। আহত অবস্থায় হুজির সদস্য মাসুদ আহমেদ ওরফে শাকিল (বাসা ঢাকায়) ও আবু ওবায়দা ওরফে হারুনকে (বাড়ি ফেনী) জনতা ধরে পুলিশে সোপর্দ করে।

মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, ২০০১ সালেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া শাকিল ঘটনার বিবরণ দেন। কিন্তু কিছুদিন পর পুরো বিষয় ধামাচাপা পড়ে যায়। ২০০৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি মাদ্রাসা থেকে মুফতি হান্নানের ‘গুরুখ্যাত’ আরেক জঙ্গিনেতা মাওলানা আবু সাইদ ওরফে আবু জাফরকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। মাওলানা আবু সাইদ ২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর সিলেট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জবানবন্দি দিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার কথা স্বীকার করেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরের মধ্যে শেখ হাসিনার হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে যাওয়ার কথা ছিল। পরে তাঁরা খবর পান, শেখ হাসিনা হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে যাবেন। দুই মাজারে ওত পেতে থাকার পর সন্ধ্যায় জানতে পারেন, শেখ হাসিনা সরাসরি জনসভাস্থলে চলে যাবেন। এরপর জঙ্গিরা জনসভাস্থলের অদূরে তাঁদের ভাড়া করা মেসে গিয়ে ওঠেন। ওই মেসেই রাত আটটার দিকে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে তাঁদের বোমা বিস্ফোরিত হয়। ফলে ওই হামলা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগে ২০০১ সালের ৩০ মে খুলনায় রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হুজি-বি। তিন দিন আগে ২৭ মে সেতুর কাছাকাছি রূপসা নদী থেকে দুটি ইঞ্জিনের নৌকাভর্তি ১৫ জঙ্গি ধরা পড়ে যাওয়ায় সেটিও আর সফল হয়নি। এই ১৫ জনের একজন মাসুম বিল্লাহ ওরফে মুফতি মইন ঢাকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অংশ নিয়েছিলেন।

নৌকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এই ১৫ জন মুফতি হান্নানের নেতৃত্বাধীন হুজির সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কুতুবউদ্দিন ওরফে বাবুর বাড়ি শৈলকুপা উপজেলার কেষ্টপুর গ্রামে। তিনি ২১ আগস্ট হামলা মামলার দুই আসামি ও হুজির আঞ্চলিক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়েরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

পরে ওই মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসামিরা সবাই কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে যান। এ ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আর কোনো তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জঙ্গিদেরও আগে ১৯৮৯-এর ১১ আগস্ট রাতে ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড হামলা চালায়। ওই হামলাও শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ছিল, এ অভিযোগে ঢাকার ধানমন্ডি থানায় দুটি মামলা হয় তখন। মামলা দুটির বিচার এখনো শেষ হয়নি।

২০০০ সালে হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত হুজির

হুজি-বির অন্যতম শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন। এরপর তিনি ২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর এবং ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর দুই দফায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বিভিন্ন হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিবরণ দেন।

মুফতি হান্নানের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজি-বির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। ওই বছরের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে দুটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল। সমাবেশের আগে পুলিশ তা উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় করা দুটি মামলার বিচার শেষে গতকাল রায় দিলেন আদালত।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার যতগুলো চেষ্টা হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হলো চারদলীয় জোট সরকার আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলা। ওই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ নেতা-কর্মী নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ শত শত নেতা-কর্মী। এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ সে মামলা নেয়নি। তার আগে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। তৎকালীন সরকার মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। নোয়াখালীর গ্রাম থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে ধরে নিয়ে এসে আদালতে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু করে এবং একের পর এক সত্য বেরিয়ে আসতে থাকে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অধিকতর তদন্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে বিএনপির নেতা তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আরও অনেকের নাম আসে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার বিচার অনেক আগেই সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। যেহেতু এই ঘটনায় তদানীন্তন বিএনপি সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। তাই তারা কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। উল্টো তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে জজ মিয়ার নাটক তৈরি করে। তিনি বলেন, ‘ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। আল্লাহর মহিমায় বঙ্গবন্ধু কন্যা বেঁচে গেছেন। মামলাটির বিচার এখন শেষ পর্যায়ে আছে। আশা করি অচিরেই বিচার সম্পন্ন হবে। আমরা ন্যায়বিচার পাব।’

১০১ হত্যার নেপথ্যে মুফতি হান্নান
শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার প্রতিটি ঘটনার প্রধান আসামি হুজি-বি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই জঙ্গিনেতার বাড়িও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। লেখাপড়া করেন পাকিস্তানের করাচির নিউ টাউন মাদ্রাসায়।

আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হন মুফতি হান্নান। একপর্যায়ে তিনি দেশে ধর্মভিত্তিক উগ্রপন্থার সূচনাকারী হুজি-বির অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত হন। তাঁর নেতৃত্বে এ দেশে হুজি-বি প্রথম বোমা হামলা চালায় ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে। এরপর সাত বছরে অন্তত ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনা ঘটায় তারা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০১ জন। আহত হয়েছেন ৬০৯ জন।

এসব বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা হয়েছে। দুটির বিচার শেষ হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায়ে মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল। এর মধ্য দিয়ে এ দেশে জঙ্গিবাদের একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।

বারবার হত্যার চেষ্টা হুজির

প্রথম ঘটনা

গোপালগঞ্জ ২০ জুলাই, ২০০০

দ্বিতীয় ঘটনা

খুলনা ৩০ মে, ২০০১

তৃতীয় ঘটনা

সিলেট ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০০১

চতুর্থ ঘটনা

ঢাকা ২১ আগস্ট, ২০০৪

মূল পরিকল্পনাকারী জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নান

(ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসি কার্যকর ১২ এপ্রিল ২০১৭)

Add a Comment