You are here: Home » নারী » ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তাসলিমা

ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তাসলিমা 

1483634631

ছোট্ট একটি প্রশিক্ষণ আর সামান্য মূলধন
রাবেয়া বেবী ০৬ জানুয়ারী, ২০১৭ ইং
ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তাসলিমা
সারাদিন তাসলিমার দম ফেলার সময় নেই। চোখের পলকেই যেন হাটবার চলে আসে। তিনহাটে দোকান নিয়ে পাইকারি মাল বিক্রি করা কি চারটিখানি কথা। পাঁচ হাজার করে হলেও সপ্তাহে ১৫ হাজার পোশাক তৈরি করতে তিন হাটের জন্য। ফজরের সময় থেকে শুরু করে হাটে হাটে মাল দিয়ে বাড়ি ফিরতে হাটবারে তার সন্ধ্যা গড়ায়। তিনি ও তার স্বামীসহ ৬০ জন সহকর্মী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারের উদয়দি গ্রামে তাসলিমা ছোট্ট একটি গার্মেন্টস পরিচালনা করছেন। নিজের জীবনে তো বটে আশপাশের হতদরিদ্র নারীদের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছেন ছোট্ট একটা প্রশিক্ষণ আর বোনের কাছ থেকে নেওয়া পাঁচ হাজার টাকা ঋণ দিয়ে। এই তাসলিমাই তিন বছর আগেও স্বামীর হাতে মার খেতেন অথচ ভাত খেতে পেতেন না তিনবেলা।

সেদিনের কথা আজও ভুলতে পারেননি তাসলিমা। স্বামী আবুল কাশেম তখন তাঁতের কাজ করে সপ্তাহে পাঁচ-ছয়শ টাকার বেশি আয় করতে পারতেন না। এই টাকায় তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন যেত। কোনো প্রয়োজনের কথা বললে স্বামী গায়ে হাত তুলত। ছেলে-মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজে আয়ের একটা পথ খুঁজছিলেন তাসলিমা। এই সময় তার গ্রামে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট ফর পুওর অ্যান্ড ভালনারেবল ওমেন ইন বাংলাদেশ (ইইপি) প্রকল্পের আওতায় জেন্ডার সচেতনতায় কাজ শুরু করে ব্র্যাক। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে একবারে হতদরিদ্রদের এই প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করা হয়।

আগে থেকে একটু আধটু সেলাইয়ের কাজ জানা ছিল বলে টেইলারিং অ্যান্ড কাটিংয়ের ওপর ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নেন তাসলিমা। প্রশিক্ষণ শেষে বড় বোনের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুই হাজার টাকায় একটা পুরানো মেশিন আর তিন হাজার টাকায় টুকরো কাপড় কিনে ছেলেদের ইংলিশ প্যান্ট বানাতে শুরু করেন তাসলিমা। কিছুদিনের মধ্যে স্থানীয় বাজারে তার তৈরি শিশু পোশাকের চাহিদা বাড়ে। আরও চারটি সেলাই মেশিন যুক্ত করে প্রতিবেশি চার হতদরিদ্র নারীকে কাজ শিখিয়ে নেন তসলিমা। তার তৈরি পোশাকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ঘরে পোশাকের স্তূপ তাসলিমাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন তাকে আরও বাজার ধরতে হবে। যারা তার পোশাক কিনেন তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে তিনি গাউসিয়া বাজারেও যান। সেখানে যেতে চাইলে বলেন, আপা আপনি মেয়ে মানুষ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাল বিক্রি করতে কষ্ট হবে। তাসলিমার উত্তর ছিল কষ্ট হবে না। তাসলিমা বলেন, আমি একজন নারী হয়ে হাটের রাস্তায় পাইকারি মাল বিক্রি করতে পিছ পা হইনি। লোকে যেন মন্দ না বলে তাই স্বামীকে নিয়ে ফজরের আজানের সময় হাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি।

অন্যদের চেয়ে একটু ভাল ডিজাইন আর সহনীয় দাম, ব্যাস তাসলিমার পোশাকের চাহিদা তৈরি হয় গাউসিয়া বাজারেও। এভাবেই আড়াই হাজার, গাউসিয়া, ভৈরব, চাষাড়া, টঙ্গি, করটিয়া হাটে যেতে থাকে তাসলিমার শিশু পোশাক। এখন তিনটি বাজারে তিনটি গোডাউনসহ চার-পাঁচটি হাটে তার পোশাক যায়। ইংলিশ প্যান্টের সাথে ছোট প্যান্ট, মেয়েদের প্যান্ট, জামাসহ চার-পাঁচ ধরনের পোশাক করছেন তিনি। বাড়িতে ২০টি মেশিন বসেছে। আশেপাশের বাড়িতে আছে আরো ২০টি মেশিন। ছোট্ট একটা গার্মেন্টস তৈরি করে ফেলেছেন তাসলিমা। সপ্তাহে তার দেড় লাখ টাকার অধিক পোশাক উত্পাদন হয়। সেলাইকর্মীদের বেতন সপ্তাহে ২০ হাজার টাকার অধিক। ভৈরবের দোকানের ভাড়া ৩৫ হাজার, গাউসিয়ার ২০ হাজার আর করটিয়ার ছয় হাজার। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে তার ৫০ হাজার টাকার অধিক থাকে।

সবমিলিয়ে তাসলিমার আর্থিক অবস্থার পরির্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন এসেছে তার পরিবারিক আর সামজিক জীবনেও। স্বামী তাঁতের কাজ ছেড়ে তাকে সহযোগিতা করে। আর তাকে মারধর করে না। বরং শুরুর দিকে শ্বশুর বাড়ির কেউ একজন মেয়ে হয়ে বাজারে বাজারে ব্যবসা করার সমালোচনা করলে স্বামীই বিরোধিতা করতেন। তিনটি ছেলে-মেয়ে পড়াশুনা করে। এ বছর একজন স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দেবে। তার সাথে যে মেয়েরা কাজ করে তাদেরও আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। তাই এলাকার সবাই তাসলিমাকে সম্মানের চোখে দেখে। তার এই সাফল্যের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে গত বছর তাকে জয়ীতা সম্মাননা প্রদান করা হয়।

৯ নম্বর হাইজাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাসলিমার কাজের প্রশংসা করে বলেন, কেউ কেউ মেয়ে মানুষের হাটে-বাজারে ব্যবসার পক্ষে না থাকলে আমরা তাদের বুঝিয়েছি। ইমাম সাহেবেরাও বলেছেন তারা ইসলামের শরিয়ত অনুযায়ী ব্যবসা করছে। ইসলামে নারীর ব্যবসার জায়েজ আছে। তাছাড়া তারা নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্য অতদরিদ্রের নারীদের সহযোগিতা করছে। এখন কি স্বপ্ন দেখেন, প্রশ্ন করলে হাস্যোজ্জ্বল তাসলিমা বলেন, আমি কোনো দিনও ভুলব না আমি কি দুঃখি অবস্থায় ছিলাম। আমার মতো অনেক দুঃখি হতদরিদ্র নারী আছে। আমার পুঁজি আরও বাড়লে তেমন অনেক নারীকে কাজে লাগিয়ে তাদের ভাগ্যোন্নয়নের স্বপ্ন দেখি। তিনি আরো বলেন, টাকা না থাকলে পুরুষের মাথা ঠিক থাকে না। বউর গায়ে হাত দেয়, এটা অনেক কষ্টের।

Add a Comment