You are here: Home » সফল উদ্যোক্তা » সোনারগাঁওয়ের পাকুন্দা গ্রাম থেকে যেভাবে নাসায় রুবাব খান

সোনারগাঁওয়ের পাকুন্দা গ্রাম থেকে যেভাবে নাসায় রুবাব খান 

১০

।। জনমত.কম ।। ১৩ জানুয়ারী ২০১৬ খ্রি. ।। একটি সূর্য আর তার চারপাশে আটটি গ্রহ নিয়ে সৌরজগৎ। সূর্যের শক্তিতেই টিকে আছে আটটি গ্রহের এই পরিবার। কিন্তু এমন নক্ষত্রের কথা ভাবা যায় যেটি ১৩ লাখ গ্রহকে টিকিয়ে রাখতে পারে, হতে পারে তাদের শক্তির অন্যতম উৎস!

আমরা যে ছায়াপথে আছি সেই আকাশগঙ্গায় আবিষ্কৃত এরকম একমাত্র সূর্য বা নক্ষত্র হচ্ছে ইটা কারিনা। সূর্যের চেয়ে প্রায় দেড়শ’ গুণ বড় এবং ৫০ লাখ গুণ বেশি উজ্জ্বল এ নক্ষত্রকে ইংরেজিতে বলা হয় সুপার স্টার। বাংলায় বলা যায় মহাতারকা বা বিশাল নক্ষত্র। পৃথিবী থেকে ইটা কারিনার দূরত্ব প্রায় সাড়ে সাত হাজার আলোকবর্ষ। তবে আকাশগঙ্গার বাইরে অন্য কয়েকটি ছায়াপথে ইটা কারিনার আরও পাঁচটি জমজ আবিষ্কার করেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। আর যুগান্তকারী এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানী রুবাব খান।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির বার্ষিক সভায় পুরো বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো এই ঘোষণা দেন মাত্র ২৯ বছর বয়সী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. রুবাব খান।

এ বিষয়ে একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তার সাফল্য ও বাংলাদেশের একটি গ্রাম থেকে কীভাবে নাসায় প্রবেশ করেছেন।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছেন। এ দেশকে কোনোদিন ভুলে থাকতে পারবেন না। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তিনি দিয়েছেন বেশ কিছু সুপারিশ। বলেছেন, লক্ষ্য স্থির করতে হবে জীবনের শুরুতে। সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। চলার পথে হোঁচট খেলে চলা থামিয়ে দিতে নেই। তার কৃতিত্বে আবেগে আপ্লুত পিতা নূরুর রহমান খান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। রুবাব খানের মা ফিকরিয়া বেগম আনন্দে আত্মহারা। তার সন্তান বিশ্ববাসীর সামনে এনেছেন নতুন এক আবিষ্কার। ভাবতেই তিনি পুলকিত হচ্ছেন।

রুবাব খান পরিবারের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ের পাকুন্দা গ্রামে। রুবাব খানের মা ফিকরিয়া বেগম সেন্ট্রাল ওমেন্স ইউনিভার্সিটির দর্শনের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। পিতামাতা দুজনেই বললেন, রুবাবের পড়াশোনার জন্য কোন কিছু আমরা তার ওপর চাপিয়ে দিইনি। আমাদের দুটি সন্তান। একটি মেয়ে। মেয়ে সুমাইয়া ফারাহ খান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজির সহকারী প্রফেসর। দুটি সন্তানই বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করেছে। রুবাব খান মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

বলেছেন, তারা পাশে না থাকলে আমার এতদূর আসা সম্ভব হতো না।

কিভাবে নাসার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন? এক্ষেত্রে আগ্রহী অন্যদের কি করা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি যখন পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করছিলাম তখনই নাসায় ২ বছরের পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য আবেদন করি। ইন্টারন ও স্টাফ রিসার্চারস হিসেবে নাসা তরুণ, যুবকদের নিয়োগ করলেও যারা মার্কিন নাগরিক নয় তারা যদি নাসায় কাজ করতে চান তাহলে তাদের জন্য পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ হলো সম্ভাব্য একমাত্র পথ। তাই কোনো বাংলাদেশি যদি নাসায় কাজ করতে চান তাহলে তাকে সবার আগে পিএইচডি পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করতে হবে। জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞান বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে আমার কোনো ডিগ্রি ছিল না। অনেকেই পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, জীববিজ্ঞান, বায়োলজিক্যাল সায়েন্স, এমনকি প্রকৌশলে যারা ডক্টরেট সম্পন্ন করছেন তাদের ঘন ঘন নাসা পোস্ট ডক্টরাল প্রোগ্রামে নিয়োগ করা হয়।

বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে স্কুলজীবনে পড়াশোনা করেছি বাংলা মিডিয়ামে। আমি প্রথমে ১০ বছর উদয়ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। তারপর নটরডেম কলেজে পড়েছি দুই বছর। বাংলাদেশে এটা আমার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজিতে আমার নিরেট ভিত্তি নিশ্চিত করে দিয়েছে। সেখানে পুঁথিগত শিক্ষার বাইরেও অন্য প্রোগ্রামগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। ২০০৪ সালে তিনি জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার ওপর পড়াশোনার জন্য কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি লাভ করেন। ২০০৮ সালে সেখানে তিনি গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে সম্পন্ন করেন পিএইচডি ডিগ্রি।

নিজের পারিবারিক বিষয়ে তিনি বলেন, আমার পিতামাতা বসবাস করেন ঢাকায়। আমার মায়ের নাম ফিকরিয়া বেগম। তিনি সেন্ট্রাল ওমেন্স ইউনিভার্সিটির দর্শনের একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। পিতার নাম নূরুর রহমান খান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। আমার শ্বশুরের নাম আবদুল আজিজ খান। তিনি তিতাস গ্যাস টি অ্যান্ড ডি কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত এমডি। শাশুড়ি জনতা ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা।

নাসার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে রুবাব বলেন, যেহেতু এটি একটি সরকারি গবেষণা কেন্দ্র, তাই নাসায় কাজ করার অভিজ্ঞতা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার তুলনায় অনেক ভিন্ন। আমি কাজ করি নাসা গোডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে। এটি নাসার সবচেয়ে বড় গবেষণা কেন্দ্র। এখানে কাজ করেন ১৩ হাজারের বেশি মানুষ। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাস্টোনমি বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বিভাগে মাত্র কয়েক শত মানুষ থাকেন। এটা বিস্ময়কর যে, মার্কিন সরকার এই মৌলিক গবেষণায় এত বেশি অর্থ বিনিয়োগ করে। আমি নাসায় কাজ না করলে এটা বুঝতেই পারতাম না।

যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি করপোরেশনগুলোতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী কাজ করছেন। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, বিভিন্ন পেশাদার আমাদের দেশকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছেন। তাদের একজন হতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।

সর্বশেষ বাংলাদেশের তরুণ, যুবক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি কিছু অনুসরনীয় বিষয় উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশি একজন শিক্ষার্থীর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বেশ কতগুলো পথ আছে। তা হলো- ১. এইচএসসি পরীক্ষার পর এসএটি এবং টোফেল সম্পন্ন করা উচিত। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের কোন শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে। এ দুটি জিনিস থাকলে আন্ডারগ্রাজুয়েটের জন্য আবেদন করতে হবে।

২. পদার্থবিজ্ঞান, এপ্লায়েড ফিজিক্স, গণিতে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে বাংলাদেশে। দিতে হবে জেনারেল জিআরই, পদার্থবিজ্ঞানের ওপর জিআরই পরীক্ষা। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পদার্থ অথবা অ্যাস্ট্রোনমি পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদন করা যাবে।

৩. বাংলাদেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যা বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করতে হবে। এটা করার সময় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থাকতে হবে। ভারতেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যারা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ওপর ডিগ্রি ও গবেষণার সুযোগ দিয়ে থাকে। এটা একটা ভালো সুযোগ হতে পারে।

বাংলাদেশের আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য আমার সাজেশন হলো, জীবনের প্রারম্ভেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। সামনে যত সুযোগ আসবে তা হাতছাড়া না করে, তার সবটার সদ্ব্যবহার করতে হবে। সব ক্ষেত্রে সফলতা না এলেও তা করতে হবে। প্রচলিত নয় এমন প্রেক্ষিতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের অবশ্যই তার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কেউ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা চীনে আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রোগ্রাম সম্পন্ন করার জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নেন তাহলে তার উচিত হবে না বাংলাদেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়াকে অবহেলা করা। এভাবেই একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরে পৌঁছার চেষ্টা করতে হবে সব সময়। এটা করলেই তাদের জন্য পিতামাতার সমর্থন পাওয়া সহজ হবে।

Add a Comment