You are here: Home » স্বাক্ষাতকার » শুধু কাঠামো তৈরি নয়, যানজট নিরসনে প্রয়োজন অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা

শুধু কাঠামো তৈরি নয়, যানজট নিরসনে প্রয়োজন অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা 

com
জনমত.কম।। ২২ নভেম্বর ২০১৫ খ্রি. রবিবার

পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রান্সপোর্টেশন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বুয়েট থেকে প্রেষণে মালয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস প্রোগ্রামে ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজ করেন তিন বছর। ট্রান্সপোর্টেশন ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে তার রয়েছে ২৫ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা। কাজের ক্ষেত্র ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম সিমুলেশন, ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ অব ট্রান্সপোর্ট, পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন, ফ্রেইট ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস প্রভৃতি। ঢাকার যানজট সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এম এম মুসা

 

যানজট নিরসনে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই এর রাস টেনে ধরা যাচ্ছে না। এর কারণ কি?

শুধু কাঠামো তৈরি করে যানজটের সমাধান করা যায় না। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত অনেক অংশীজন (স্টেকহোল্ডার)। কেউ যানজটের শিকার, কেউ এর মধ্যে ব্যবসা করছে, কেউ যানজটে চাকরি করছে, আবার কেউ কেউ যানজট নিয়ে রাজনীতি করছে। সেখানে এক বা একাধিক কাঠামো কীভাবে সমাধান দেবে। আসলেই দেয়ার কথা নয়। সেজন্য এটিকে একটি সিস্টেমে এনে কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং সে পরিকল্পনার মধ্যে সবাইকে ফিট করতে হবে (সবাই বলতে ব্যবহারকারী, সরকারি সংস্থা, যারা ব্যবসা করছে এবং যারা রাজনীতি করছে এটি নিয়ে)। যখনই সবাইকে ফিট করা যাবে, তখনই কেবল যানজট নিরসন হবে। আরেকটু পরিষ্কার করা যাক— এক. দুই বা ততোধিক কাঠামো নির্মাণ করা যায়। কিন্তু শহরওয়ারি যে ফ্লো বা ফ্লোর বিভিন্ন মাধ্যম কিংবা যারা ফ্লো করায় (বাস কোম্পানি), তাদের সঙ্গে কাঠামোর কোনোই সম্পর্ক নেই। এখানে একটি সমন্বিত কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে সবাইকে সংস্থান করা যায়। যেমন— পথচারীকে কীভাবে ব্যবস্থা করা যায়, তার সংস্থান থাকতে হবে। মধ্যম আয়ের মানুষকে কোথায় সংস্থান করা যাবে, তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত বা অপরিকল্পিতভাবে ব্যবসা করছে, এমন বাস কোম্পানিকে কীভাবে আলোচ্য কর্মসূচির মধ্যে ফিট করা যায়, সেটা চিন্তা করতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি সংস্থা— ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ), সিটি করপোরেশন, রাজউক, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটি এবং বিআরটিএকে কীভাবে পুরো কর্মসূচির মধ্যে ফিট করা যাবে, সেটি পরিকল্পনা করতে হবে। এ পরিকল্পনা হলো প্রথম। আমরা অনেক সময় কাঠামোভিত্তিক পরিকল্পনার কথা বলি। এটি একটি অংশ মাত্র। যেহেতু। বিদ্যমান কাঠামো যে যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না, এটিও যানজট তৈরির একটি কারণ। এ শহরের ৩০-৪০ ভাগ লোক পথচারী। সেখানে ৯৫ শতাংশ ফুটপাত যে বেদখল ও ব্যবহার অযোগ্য অবস্থায় আছে, এর দায়িত্ব কে নিচ্ছে? কেউ তো নিচ্ছে না। ৪০-৫০টি বাস কোম্পানি বিশ্বের কোথাও নেই। তারা পরস্পর প্রতিযোগিতা করে রাস্তা আটকে দিচ্ছে। এটি পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যাবে না। এর কারণ হলো, বেশির ভাগ জায়গায় একটি কোম্পানি। কদাচিৎ দুটি কোম্পানি। বড় জোর তিনটি। নিশ্চয়ই একটি কোম্পানি থাকলে এ প্রতিযোগিতা হবে না। বাস খুব উপকারী একটি গণমাধ্যম, কিন্তু সেটি এখানে ভিলেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

 

যানজটের ক্ষেত্রে বাসই কি একমাত্র সমস্যা, না আরো কিছু আছে?

শুরুতেই বলছিলাম, সবাইকে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আলোচ্য কর্মসূচিতে প্রথমে আসবে পথচারী, এর জন্য খরচ সবচেয়ে কম। সম্ভবত ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিলে ঢাকায় মোটামুটিভাবে একটি স্ট্যান্ডার্ড ফুটপাত নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব। এতে ৩০-৪০ শতাংশ যাত্রীর সমস্যা সমাধান করা যাবে। কে ফুটপাতের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে, কে লাইটিং মেনটেইন করবে, ফুটপাত দখলমুক্ত কে করবে— তার জন্য একটি কর্মসূচি নিতে হবে। এটিকেই আমি কর্মসূচি বলছি।

দেখা গেল, ফুটপাত দখল হয়ে আছে। পথচারী হাঁটতে পারছে না। তাহলে সে কোথায় হাঁটবে? নিশ্চয়ই রাস্তায়। আবার আমাদের পার্কিংয়েরও সমস্যা আছে। রাস্তায় কিন্তু এরই মধ্যে এক-দুই লেন ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাস মিলে দখল করে রেখেছে। সুতরাং সেখানেও পথচারী হাঁটতে পারছে না। পার্কিংটা পার হয়ে তার পরই সে রাস্তায় হাঁটছে। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ রাস্তার অর্ধেক শুরুতেই নেই। শহরে কোথায় বাসগুলো থামানো হয়। নিশ্চয়ই ক্রিটিক্যাল জায়গাগুলোয়। এসব জায়গায় পার্কিং ও হকারের সমস্যা একটু বেশি। এর পর আছে বাসগুলোর যত্রতত্র লোক ওঠা-নামা করানো। সেসব বাস দখল করছে রাস্তার বাকি অর্ধেক। ফলে যে পরিমাণ রাস্তা আছে, তাও ব্যবহার হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে।

ঢাকা শহরে চার-পাঁচটি করিডোর আছে। সেটিও যদি গাড়ি রেখে দখল করা হয়, তাহলে তো আর শহর থাকবে না। সুতরাং ব্যাপারটি খুবই সহজ। প্রয়োজনভেদে কিছু বহুতল পার্কিং বে তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বলতে হবে রাস্তায় পার্কিংয়ের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। মানুষকে যথাযথ ব্যবস্থা করে যদি বলা হয়, রাস্তায় পার্কিং করা যাবে না। সেটি মানুষ কেন শুনবে না? ওই যে বললাম, কর্মসূচি নেই। কর্মসূচির একটি অংশ হবে পরিকল্পিত বহুতল পার্কিং তৈরি করা।

পরিকল্পনা যদি থাকত রাস্তা অবৈধ পার্কিংমুক্ত করতে হবে, তখন পার্কিং গ্যারেজ তৈরি হবে। ফলে তখন রাস্তায় অবৈধ পার্কিং থাকছে না। তার মানে পথচারী ফুটপাত দিয়ে হাঁটবে। রাস্তার একেবারে বাঁ দিকের লেনটিও তখন মুক্ত। সেখানে প্রধানত বাস চলবে। একটি কোম্পানি হলে তখন সেখানে ৩ মিনিট পর পর একটি বাস চালানো যাবে। এতে ব্যাপকভাবে ফ্লো সৃষ্টি করা। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের রাস্তা চার থেকে ছয় লেন পর্যন্ত আছে। কমপক্ষে তিনটি লেন তো আছেই। এর মধ্যে একটি লেন বাস চলার জন্য দিয়ে দেয়া হলে তাও তো আরো দুটি থাকে। আমার ধারণা, ক্ষেত্রবিশেষে এখন এক লেনও পাওয়া যায় না। সুতরাং রাস্তা থাকলে হবে না, কার্যকারিতা কতটুকু আছে, সেটিও দেখতে হবে।  কার্যকর নেই কেন? কারণ পরিকল্পিত কর্মসূচি নেই। বাম লেন দিয়ে ২-৩ মিনিট পর পর বাস গেলে রাস্তায় বাসের জন্য শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা হতো না। আবার এ অবস্থার মধ্যে জংশনগুলো বিদ্যমান অবস্থায় রাখলে বাসগুলো জংশনে আটকে যাবে। ব্যক্তিগত গাড়িগুলোও সেখানে আটকে যাবে। এটি থেকে মুক্তি দরকার। এরই মধ্যে আমাদের অনেক ফ্লো ডিমান্ড তৈরি হয়েছে। শহর ছোট, জনবসতি বেশি। সে হিসেবে গাড়ি তো বাড়বেই। এক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ, জংশনগুলোকে সিগনালমুক্ত করা। এর সমাধান হলো, প্রয়োজনীয় আন্ডারপাস ও ওভারপাস এবং ইউলুপ করা। তখন করিডোরটি সিগনালমুক্ত থাকবে। বাম লেনে চলছে বাস। বাকি লেন দুটিতে চলছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন। সুতরাং এটি দিয়ে আমরা বিপুল ফ্লো ক্যাপাসিটি সৃষ্টি করতে পারব। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে ৪ হাজার কোটি টাকা হলেই ঢাকা শহরের চার-পাঁচটি করিডোর সিগনালমুক্ত করা যায়।

 

তাহলে রিকশা কোথায় থাকবে?

রিকশার একটি ক্যাপাসিটি এবং ইউটিলিটি আছে। সেটি কখনই ১০০ ফুট ছয় লেনের রাস্তার জন্য নয়। রিকশা হলো পাড়ায় চলাচলের জন্য। এটি দিয়ে এক-দেড় কিলোমিটার যাওয়া যাবে। এটি সংকীর্ণ রাস্তার জন্য। আমাদের প্রস্তাব হলো, যেহেতু আমরা বড় রাস্তায় বাস দিয়ে ক্যাপাসিটি বাড়াতে চাইছি, সেহেতু রিকশা চলতে দিলে তা কাজে আসবে না। এখন কি দেখতে পাই? প্রতিটি জংশনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়টিতে রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। যে জায়গা এত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে রিকশা দাঁড়িয়ে থাকলে ক্যাপাসিটি কাজে লাগাবে কি করে? এটিই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। আমাদের পরামর্শ, রিকশাকে জোনের মধ্যে নিয়ে আসা। এটি কর্মসূচির একটি অংশ হতে পারে। যেমন— আজিমপুরের ৫০টি রিকশা সেখানেই চলবে। ধানমন্ডির ১০০টি রিকশা চলবে কেবল ওই এলাকায়। আর যারা বাইরে যাবে, তারা হয় বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে যাবে নতুবা হেঁটে। সুতরাং সবাইকে একই কর্মসূচির আওতায় আনাটা অত্যন্ত জরুরি।

 

আমরা নানা প্রকল্প দেখছি। ওগুলোর ফলাফল কী?

মেট্রোরেল ২০১৯ সালে আসবে। আবারো বলছি, শহরওয়ারি পরিকল্পিত কর্মসূচি না নিলে কখনো যানজটের সমাধান হবে না। মেট্রোরেল সুনির্দিষ্ট একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। শহরের বাকি অংশের কী হবে? সব মানুষ তো মেট্রোরেল থেকে সুবিধা পাবে না। আবার যেমন সিস্টেমের কথা বলেছি, সে রকম না করলে লোকজন তো আকর্ষিত হবে না। ফুটপাতই যদি না থাকে, হেঁটেই যদি ট্রেনে ওঠা না যায়; তখন তো মানুষ বলবে ব্যক্তিগত গাড়িই ভালো ছিল। তাই গণপরিবহন জনপ্রিয় হওয়ার প্রথম শর্ত হলো, চমত্কার ফুটপাত নেটওয়ার্ক। এজন্য আমি এটিকে ১ নম্বর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি।

 

সরকার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। আপনি যেসব কর্মসূচির কথা বললেন, সেটি নিশ্চিত না করে আলোচ্য উদ্যোগ কি ফলপ্রসূ হবে?

কোনোভাবেই নয়। কারণ গাড়ি কেনা এক বিষয় আর ব্যবহার অন্য বিষয়। দুটি গাড়ি থাকা অবস্থায় কেউ হাঁটতে চাইতে পারে কিংবা বাসে যেতে চাইতে পারে— যদি হাঁটার সুযোগ কিংবা বাসে মানসম্পন্ন সেবা থাকে। এটি না দিয়ে বেঁধে রাখলে তা মানবে না মানুষ। এখন অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য ১ হাজার বা ৫০০ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। তবু থামানো যাচ্ছে না। সুতরাং বিকল্প ব্যবস্থা না করে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া হাস্যকর ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

গণপরিবহন সেবা বেসরকারি খাতে থাকবে না সরকারি খাতে থাকবে, সেটি নিয়ে একটি বিতর্ক আছে। এক্ষেত্রে আপনার মত কি?

আদর্শগতভাবে বেশির ভাগ দেশের সিটি বাস সিস্টেম সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি দ্বারাই চলে। ঢাকা ওয়াসা লাভজনকভাবে চলছে। একইভাবে একটি সরকারি বাস কোম্পানি করে সেখানে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে তাকে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দিলে তা ভালোভাবে চলবে।

সমস্যা আমরা সবাই বুঝছি। সমাধান করছি না কেন? হয়তো সমাধান চায় না একটি গ্রুপ। আমাদের দেশে সমস্যা যত বড় হয়, সেটি অনেকের জন্য লাভজনক হয়।

 

আমরা দেখছি, অনেক বিশেষজ্ঞ যানজট সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। তবু তা নিরসন হচ্ছে না…

আমি তা মনে করি না। আমি তাদের নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। যেসব বিশেষজ্ঞ বলেন, শহরের ট্রান্সপোর্টেশন সমস্যা সমাধানের জন্য ২৫ শতাংশ রাস্তা প্রয়োজন। তাদের আমি ব্যর্থদের তালিকায় রাখি। ২৫ শতাংশ রাস্তা কয়টি শহরে আছে? সেসব শহরে কি ঢাকার মতো যানজট আছে। এমনকি সিঙ্গাপুরেও তো মাত্র ৮ শতাংশ রাস্তা রয়েছে। সুতরাং তারা বিশেষজ্ঞ নন। বিশেষজ্ঞ হলে তারা বলতেন পরিকল্পনা বা কর্মসূচির কথা। তারা তা বলেন না। তারা বলেন, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কথা। তার মানে, তারা ট্রান্সপোর্টেশন সমস্যা বোঝে না। এটি বুঝলে সব অংশীজনকে একই কর্মসূচির আওতায় একসঙ্গে আনতেন।

 

যে পরিমাণ রাস্তা আছে, তা কি যথেষ্ট?

আমি গ্যারান্টি দেব যে, এর চেয়ে কম রাস্তা নিয়ে ট্রান্সপোর্টেশন অনেক ভালোভাবে চলছে। রোগী যেমন, তদানুযায়ী সমাধান দিতে হবে। যেটি নেই, সেটি নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। আমার শহর দাঁড়িয়ে গেছে; এর মধ্যেই সমাধান দিতে হবে।

 

আপনি ইউলুপের কথা বলছেন। সেটি কিভাবে কাজ করবে?

ইউলুপটা হলো যেখানে আমরা আন্ডারপাস বা ওভারপাস করতে পারব না। আন্ডারপাস বা ওভারপাসে কেবল এক ডিরেকশনে লোকজন নিয়ে যেতে পারে। তাহলে ক্রসিং এবং রাইট টার্নিং লোকজনকে ফ্যাসিলেটেড করার জন্য কিছু জায়গায় ইউলুপ দিতে হবে। সিগনাল না থাকায় ক্রসিং বন্ধ করে দেয়া হবে, সেক্ষেত্রে মানুষ যাতে এক পাশ থেকে অন্য পাশে গিয়ে রাইট টার্নিং বা ক্রসিং করতে পারে। সুতরাং আমি যেসব পরিকল্পনার কথা বলছি, সেসব ক্রমানুসারে বাস্তবায়ন করা হলে যানজটের সমাধান হবে। এটি গ্যারান্টি দিতে পারি। আর তা না করে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও সমাধান আসবে না। কেউ একজনকে প্রথমে নিশ্চয় ঢাকা শহরে কার্যকর ফুটপাত নেটওয়ার্ক তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে। এতে ৩০-৪০ শতাংশ মানুষের সমাধান হবে। একইভাবে এক কোম্পানির অধীনে বাস চালু করলে অন্য ৪০ শতাংশের সমাধান হবে। তার পর রাস্তার দুই লেনে যেহেতু আর কাউকে থামতে হচ্ছে না সেহেতু বাকিরা ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়বে। ব্যক্তিগত গাড়িকে যারা বন্ধ করতে বলে, তারা আসলে সমাধানে যেতে চায় না। আমি মনে করি, ব্যক্তিগত গাড়িকে অবশ্যই চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থ দিয়ে লোকজন মার্সিডিজ কিনতে না পারলে তারা তো চলে যাবে। সুতরাং তাদের সব রকম বিলাসিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। না হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উঠিয়ে দিন। তখন মার্সিডিজ কেনার টাকাও মানুষের হাতে জমবে না। এখন টাকা হয়েছে, অথচ কিনতে দিচ্ছেন না। তাহলে আপনি হারবেন। তারা টাকা নিয়ে কানাডা, আমেরিকায় চলে যাবে। যারা গাড়িকে বেশি কষাকষি করতে বলেন, তারা বোকা। তারা অর্থনীতিই বোঝেন না। অর্থনীতি না বুঝলে ট্রান্সপোর্টও বোঝা যাবে না। দুটিই অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

 

তার মানে অস্থায়ী ভিত্তিতে যেসব সমাধান দেখছি, তা বাস্তবে প্রকৃত সমাধান নয়?

এটি হলো হাতুড়ে ডাক্তারের মতো টাকা কামানোর ধান্ধা। কোনো কোনো এজেন্সির প্রজেক্ট নেয়ার ধান্ধা। কারো কারো মুখ দেখানোর ধান্ধা। মূলত যা দেখা যাচ্ছে, তা এসবেরই ফসল। সমস্যাকে হাতে নিয়ে সমাধান করব, এটি তা নয়। সমাধান হলো, সেট করা প্রোগ্রামের আওতায় এক এক করে সবগুলোর বাস্তবায়ন।

 

অনেকেই বলেন, শহরে বিদ্যমান স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময় যানজট হয়। এ মতকে কীভাবে দেখেন?

এটি সত্যি কথা। এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি প্রোগ্রাম যখন তৈরি হবে, তখন তার আওতায় এগুলোকে হয়তো কিছুটা শিফট করা যাবে। ভালো বাস সিস্টেম চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের বাসে পাঠানোর কথা বলা যাবে। এখন কি ঢাকা শহরের অভিভাবকদের সন্তানকে বাসে পাঠানোর কথা বলা যায়? অথচ কলকাতায় দেখুন, হাজার হাজার শিক্ষার্থী ট্রেনে-বাসে করে যাচ্ছে। কেন? কারণ সেবাটি নির্ভরযোগ্য।

 

ইদানীং বেসরকারি কোম্পানি দিয়ে সড়ক-ব্রিজ উন্নয়নের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে? এটিকে কীভাবে দেখেন?

এখানে ব্যাপারটি খুবই সহজ। যেখানে হিসাব আছে— এত গাড়ি চলবে, সেখানে বেসরকারি খাতকে না এনেও পারা যায়। যেটি স্পষ্টত লাভে চলবে, সেখানে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার দরকার কি? সরকার হয়তো অনেক কম খরচে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেত। সরকারের টোল নিতে অসুবিধা কোথায়? সরকারের তো ব্যবসা করার দরকার আছে। কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি কোম্পানিকে দিয়ে খরচটা অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার ধারণা, এসব কাজ সরকার করলে আরো ভালো হতো।

 

আমরা অবকাঠামো তৈরি করছি বটে, কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ফান্ড নেই?

আমি যে প্রোগ্রামের কথা বলছি, তাতে আরেকটি অংশ হবে মেইনটেন্যান্স। রাস্তার এক লেন যদি ভাঙা থাকে, ম্যানহোল ঠিক করতে গিয়ে উঁচু-নিচু থাকে; তাহলে তো ওই লেনে কেউ যাবে না। এজন্য বলেছি, রাস্তার প্রতি ইঞ্চি জায়গা যেন ব্যবহার করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

এটি কি বাংলাদেশ করতে পারবে?

কেন পারবে না? আমার ধারণা, বার্ষিক ১০০ কোটি টাকা দিয়ে প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবহারযোগ্য করে তোলা সম্ভব, যদিও এখন ঢাকা সিটি করপোরেশন বার্ষিক ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। আমার ধারণা, ১০০ বা ১৫০ কোটি টাকায় চুক্তিভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেয়া হলে অনেক কোম্পানিই রাজি হবে। বেসরকারি কোম্পানিটি নিশ্চয় রাস্তা খাদ হয়েছে এর জন্য বসে থাকবে না। তার ইঞ্জিনিয়ার একটি মোবাইল টিম নিয়ে প্রয়োজনীয় রসদসহ ঘুরতে থাকবে। যেখানেই খাদ হয়েছে, সেখানে চারদিকে লাল বেড়া দিয়ে দ্রুতগতিতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ঠিক করে ফেলবে। এখন কি হচ্ছে? খাদ হচ্ছে এখন আর টেন্ডার হচ্ছে দুই বছর পর। এক খাদ তত দিনে ১০০ খাদে পরিণত হচ্ছে। এটিকে রক্ষণাবেক্ষণ বলে না। সুতরাং ওই প্রোগ্রামের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও থাকতে হবে।

 

Add a Comment