You are here: Home » মতামত » সম্পাদকীয় : বেতন বৃদ্ধির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

সম্পাদকীয় : বেতন বৃদ্ধির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া 

জনমত ডটকম ।।

বেতন বৃদ্ধির সুফল-কুফল নিয়ে লিখতে বসার পূর্বে দীর্ঘদিন ভাবতে হয়েছে। কেননা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন সাবেক কর্মচারীর সন্তান হিসেবে আমিও প্রত্যক্ষভাবে বেতন বৃদ্ধির সুফল ভোগ করছি। যেহেতু পিতার আয় বৃদ্ধির সাথে সন্তানের ভোগবৃদ্ধি জড়িত সেহেতু পিতারপক্ষ হয়ে বেতন বৃদ্ধির জন্য সরকারকে সাধুবাদ দিতেই হয়। কিন্তু ঘোষণা দিয়ে এমন বেতন বৃদ্ধি গোটা দেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে তা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভাবনার বাইরে রাখলেও চলে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুলাই মাস থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতন-ভাতার সুযোগ পাচ্ছেন। ৮ম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারি-কর্মচারী-কর্মকর্তার সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত) এবং মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে নববর্ষ ভাতা পাবেন। যে সকল কারণে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি, কাজের তৎপরতা আনয়ন এবং মেধাবী তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্টকরণ। নতুন বেতন কাঠামোর কারণে চলতি বছরে দেশের ২১ লাখ (কর্মরত-অবসরপ্রাপ্ত) সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত ১৬ হাজার কোটি টাকা মূল্যের কাগজি মুদ্রা ছাপাতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয় কেননা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের গতিশীলতা আনয়নের জন্য অধিক অর্থ দিয়ে তাদের চালিত করার উদ্যোগ মন্দ নয় কিন্তু বেতন বৃদ্ধির সাথে সাথে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য কি কি ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে তা দৃশ্যমান নয়। সময়ের তালে বেতন বৃদ্ধি হয় কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে বেতন বৃদ্ধি করতে গিয়ে যে নানামুখী সমস্যার সৃৃষ্টি হবে তা নিশ্চিত।প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উন্নত জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সকল কাজে গতি আসুক সেটা রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের যৌথ চাওয়া। মেধাবী তরুণরা সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহী হোক সেটা রাষ্ট্রের চাওয়া। কাজেই সরকারের দৃষ্টিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি আবশ্যক ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান কত উচ্চে আসীন করতে হবে? বেতন বৃদ্ধির পর দৃব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গণপরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধির দায় মিটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটুকু লাভবান হবেন? সরকারি কাজে গতি আসুক সেটা সর্বাবস্থায় কাম্য। প্রশ্ন হচ্ছে, উচ্চ বেতন মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে দিতে পারে কি? যদি পারে তবে অতীতের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে বেতন ছিল তা মোটেও অযৌক্তিক ছিল না কিন্তু তখন কি তবে তারা ইচ্ছা করেই তাদের কাজের গতি শিথিল করে রেখেছিল? বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে মেধাবী তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্টকরণের বিষয়টি একটু হাস্যকরই বটে। চাকরির ক্ষেত্রে অধিক কোটা পদ্ধতি, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতি-সুপারিশ ছাড়া এদেশে কয়টি চাকরি হয়? কাজেই মেধাবীদের আকৃষ্টকরণের বিষয়টি একটি মিষ্টি আওয়াজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। তারপরেও সরকারের সৎ উদ্দেশ্য সফল হলে সেটা রাষ্ট্রেরই মঙ্গল। কথা হচ্ছে, বর্ধিত অর্থ আসবে কোথা থেকে? নিশ্চয়ই জনগণের প্রতি ট্যাঙ্রে বোঝা আরেক ধাপ বৃদ্ধি করা হবে। তাছাড়া নতুন বেতন কাঠামোর কারণে যে বৈষম্য সৃষ্টি হবে তা রোধের উপায় কি? বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা হওয়ার পরেই দেখা গেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বৈষম্যের কারণে কর্মবিরতি পালন করেছে। পাবলিক-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ যারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়ে আন্দোলন করছেন তাদের দাবি পূরণ হয়ে হয়তো সমাধান হয়ে যাবে কিন্তু বেসরকারি খাত? সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে যখন দ্রব্যমূল্য, গণপরিবহণ ভাড়া, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাবে তখন বেসরকারি খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়বে। মাত্র ২১ লাখ (কর্মরত-অবসরপ্রাপ্ত) এবং তাদের দ্বারা পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হওয়া ৫-৭ কোটি মানুষের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে প্রায় ১০-১১ কোটি মানুষকে সমস্যায় ফেলা কতটুকু যৌক্তিক হয়েছে? যাদের বেতন বৃদ্ধি করা হলো তাদের যে চলছিল না এমনটাও তো নয়। বেতন ?বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে তা আর কমানো যায় না কিন্তু বৃদ্ধি যখন করাই হলো তখন একবারে ৮৭-১০১ শতাংশ বৃদ্ধি না করে আরেকটু কম করলে সেটা বোধহয় ভালো হতো।

বাংলাদেশের সবচেয় বড় সমস্যা দুর্নীতি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের মুখ থেকে তার অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কথা দেশবাসী বহুবার শুনেছে। সরকারি অফিসগুলো যেন দুর্নীতির আখড়া। বেতন বৃদ্ধির সাথে যদি আমরা নিশ্চয়তা পেতাম যে দু্র্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে তবুও সাধারণ মানুষের স্বস্তির যায়গা থাকত। কিন্তু দেশবাসী কি আদৌ সে নিশ্চয়তা পাচ্ছে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপের আলামতও আপতত দৃশ্যমান নয়। কাজেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পূর্বের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেতন পাবেন আর সাথে যদি ঘুষও গ্রহণ করেন তবে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য বোঝাস্বরূপ হবে। অর্থমন্ত্রী ভাষার স্পিড মানি তো সরকার এখন বৈধভাবেই দেয়ার ব্যবস্থা করেছে কাছেই অবৈধ স্পিড মানি আদান-প্রদান কিভাবে বন্ধ করা যায় তার রূপরেখা সরকারকে দিতে হবে। বেকার সমস্যা বাংলাদেশে দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। দেশে প্রায় ৩০ লাখ বেকার। বেকারত্ব এখন রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেকাররা রাষ্ট্রের কল্যাণে তো আসছেই না বরং ভয়াবহভাবে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করছে। সরকার যদি বেতন বৃদ্ধি না করে সেই টাকার বিনিময়ে প্রজাতন্ত্রে জনবল বৃদ্ধি করত তবে সেটা মঙ্গলজনক হতো। এতে একদিকে যেমন অর্থিক সঙ্কট সৃষ্টি হতো না তেমনি কাজের গতিও বহুগুণে বেড়ে যেত। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টির বিপরীতে সন্তুষ্টি তৈরি হতো। কেননা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেকার ভাই, সন্তান, স্ত্রী কিংবা অন্যকোনো আত্মীয় চাকরি পেলে তারাই সবেচেয় বেশি খুশ হতো। তখন রাষ্ট্রের কোথাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মোটেও সম্ভাবনা থাকত না।

বেতন বৃদ্ধির পর সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার এ কাজে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে একদিকে যেমন বর্ধিত বেতনভোগীরা লাভবান হবে না অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মরণদশা হবে। সরকার পণ্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে একের পর এক সমস্যা উদ্ভূত হতে থাকবে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করার নৈতিক অধিকার তখন হারিয়েছি যখন শুনেছি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার পরেও সরকার পূর্বের সে উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করছে। যার কারণে ৬৮ টাকার তেল সাধারণ মানুষকে কিনতে হচ্ছে ৯৮ টাকায়। জনগণবান্ধব সরকার যখন সাধারণ মানুষের থেকে ব্যবসা গ্রহণ করে তখন ব্যবসামনষ্ক মানুষ সাধারণ মানুষকে পিষে মারলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? বেতন বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়িয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কিছু সংখ্যক আবাসনের সুযোগ পান আর যারা না পান তারা সরকার থেকে আলাদা বাড়িভাড়া পান কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে বর্ধিত বাড়িভাড়া পরিশোধ করার সামর্থ্য কতটুকু। সাধারণ মানুষের আয় বাড়ার উপলক্ষ এখনো তেমনভাবে সৃষ্টি না হলেও ব্যয়ের বহুক্ষেত্র ইতোমধ্যেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসের পহেলা তারিখ থেকে গণপরিবহণে প্রতি কিলোমিটারে ১০ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিএ। এদেশের কোটি সংখ্যক বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়েনি ঠিক কিন্তু গণপরিবহণের বর্ধিত ভাড়া তাদের পরিশোধ করতেই হবে। কাজেই বৈষম্য যতো প্রকট হবে বিশৃঙ্খল অবস্থাও ততো ঘনীভূত হবে।

যে উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার ৮ম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করেছে তার ক্রিয়ার চেয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির সম্ভাবনাই প্রবল। কেননা বেসরকারি খাতে কর্মরত কোটি মানুষের আয় দিয়ে যখন দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ মিটিয়ে জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে তখন শুরু হবে আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা। অন্যদিকে বর্ধিত বেতন পরিশোধ করতে গিয়ে অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানোর কারণে সৃষ্টি হতে পারে মূল্যস্ফীতি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থমকে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। ৫ টাকার মূল্যমানের পণ্য যখন ৭-৮ টাকায় কিনতে হবে তখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমস্যায় পড়তে হবে না কিন্তু সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস সৃষ্টি হবেই। কাজেই সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে সরকারকে কঠোর হস্তে দুর্নীতি রোধ, বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি সরকার কোনোভাবে ব্যর্থ হয় তবে নিকট ভবিষ্যতে দেশবাসীর জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হয়তো অপেক্ষা করছে।

রাজু আহমেদ : কলামিস্ট, অতিথি সম্পাদক, জনমত ডটকম (দৈনিক জনতার সৌজন্যে

Add a Comment